জাতীয় ছাত্রী – ইশতেহার (Manifesto)

১. জাতীয়, দলনিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক চরিত্র

জাতীয় ছাত্রী (chhatri.org)–কে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি জাতীয়, দলনিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে বিদ্যমান একটি মৌলিক কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিকারে।

জাতীয় অর্থ—ভূগোল, শ্রেণি, ধর্ম, মতাদর্শ বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে অন্তর্ভুক্তি। নারী শিক্ষার্থীদের এখানে খণ্ডিত স্বার্থগোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার জন্য অপরিহার্য একটি ঐক্যবদ্ধ নাগরিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দলনিরপেক্ষতা নীরবতার মাধ্যমে নিরপেক্ষ থাকা নয়; এটি নীতির মাধ্যমে স্বাধীনতা। এটি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঐতিহাসিক অপব্যবহারকে প্রত্যাখ্যান করে এবং নারী শিক্ষার্থীদের দলীয় প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বাইরে স্থাপন করে। সংবিধান এই প্ল্যাটফর্মকে পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বয়ানের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনি কর্তৃত্বের ওপর ভিত্তি দেয়, যা এর বৈধতা, ধারাবাহিকতা ও নৈতিক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে। এই তিনটি ভিত্তি একসাথে শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দখলদারিত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে এবং শিক্ষার্থীদের পরিচয়কে দলীয় নয়—নাগরিক সত্তা হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

শিক্ষা: বিশেষাধিকার নয়, সাংবিধানিক অধিকার

শিক্ষাকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে মৌলিকভাবে পুনর্গঠন করে। বিশেষাধিকার শর্তসাপেক্ষ, প্রত্যাহারযোগ্য ও বাছাইমূলক। অধিকার জন্মগত, বলবৎযোগ্য ও সর্বজনীন। শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলে— রাষ্ট্র দয়া দাতা নয়, দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষে পরিণত হয়। নারী শিক্ষার্থীরা অনুগ্রহপ্রার্থী থেকে অধিকারধারী নাগরিকে রূপান্তরিত হয়। শিক্ষা আর রাজনৈতিক আনুগত্য, অর্থনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে নৈতিক বা আইনি ভাবে যুক্ত থাকতে পারে না। এতে শিক্ষা নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার মতো মৌলিক নাগরিক অধিকারের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় নয়, রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় দায়িত্বে পরিণত হয়।

নারী শিক্ষার্থী: রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, জাতীয় সম্পদ

ইতিহাসে বাংলাদেশের নারী শিক্ষার্থীরা— সুরক্ষা ছাড়াই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, কাঠামোগত সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা ও নীরবতার শিকার হয়েছে। জাতীয় ছাত্রী এই বাস্তবতাকে মৌলিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। নারী শিক্ষার্থীদের জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্ল্যাটফর্মটি তাদের— দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উৎপাদনশীলতার অংশীদার, বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও সামাজিক পুঁজি বহনকারী, প্রজন্মগত ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে। যে রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের শোষণ করে, সে নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে। যে রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষা দেয়, সে নিজের অস্তিত্ব সুরক্ষিত করে।

সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ ও সাংবিধানিক মালিকানা

সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ ঘোষণা করে—প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।
জাতীয় ছাত্রী এই নীতিকে প্রতীকী ঘোষণা থেকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের দাবি তোলে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সাংবিধানিক মালিকানা অর্থ— রাষ্ট্রে সমান অংশীদারিত্ব, প্রতীকী অন্তর্ভুক্তি নয়, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের আইনি অধিকার, অন্যায় ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার নৈতিক কর্তৃত্ব।এটি একটি মৌলিক বৈপরীত্য উন্মোচন করে— যদি শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের মালিক হয়, তবে কেন তারা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভোগ্য বিষয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়? জাতীয় ছাত্রী নারী শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রের নির্ভরশীল নয়, বরং সার্বভৌমত্বের সহ-মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। তাদের বঞ্চনা কোনো সামাজিক দুর্ঘটনা নয়—এটি একটি সাংবিধানিক ব্যর্থতা।

নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ: অবিচ্ছেদ্য অধিকার

এই প্ল্যাটফর্ম তিনটি বিষয়কে স্পষ্টভাবে যুক্ত করে— নিরাপত্তা: শিক্ষা ও নাগরিক পরিসরে শারীরিক, মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা। স্বাধীনতা: ভয় বা জবরদস্তি ছাড়া চিন্তা, মতপ্রকাশ, অধ্যয়ন ও সংগঠনের স্বাধীনতা। নাগরিক অংশগ্রহণ: জাতীয় বিতর্ক, জবাবদিহি ও সংস্কারে অংশ নেওয়ার অধিকার। এগুলো শিক্ষার ঐচ্ছিক সংযোজন নয়—এগুলো শিক্ষার পূর্বশর্ত।
নিরাপত্তা না থাকলে শিক্ষা ভয়ে পরিণত হয়।
স্বাধীনতা না থাকলে শিক্ষা হয় মতাদর্শিক চাপ।
অংশগ্রহণ না থাকলে শিক্ষা হারায় তার নাগরিক উদ্দেশ্য।

কৌশলগত গুরুত্ব

সাংবিধানিক মালিকানার ভিত্তিতে অবস্থান নিয়ে জাতীয় ছাত্রী— দয়ার ভাষা থেকে ন্যায়বিচারের ভাষায় বিতর্ক স্থানান্তর করে, রাজনৈতিক দরকষাকষি থেকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় নিয়ে যায়।আন্দোলননির্ভর সংস্কৃতি থেকে নাগরিক বৈধতায় রূপান্তর ঘটায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি সংঘাত ছাড়াই টেকসই সংস্কার সম্ভব করে এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষমতায়নকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে। জাতীয় ছাত্রী রাষ্ট্রের ওপর ক্ষমতা দাবি করে না;
সে রাষ্ট্রের ভেতরে জনগণের মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়। যে জাতি তার নারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয়, সুরক্ষা দেয় ও ক্ষমতায়িত করে—
সে মতভিন্নতায় দুর্বল হয় না,
সে সচেতনতায় শক্তিশালী হয়।

আমাদের ভিশন

আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি—
যেখানে কোনো নারী শিক্ষার্থী নীরবতা, আত্মসমর্পণ বা নির্বাসনে বাধ্য হবে না;
যেখানে শিক্ষা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে;
এবং যেখানে ঐক্য, জ্ঞান ও নাগরিক সচেতনতা হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।